Sunday, 3 May 2015

কল্পতরু ভাণ্ডার


 কোলকাতার ভুঁড়িভোজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যদি শেষ পাতে পান না থাকে। আর সেই পান খাওয়ার মুহূর্তটিকে যদি চিরস্মরণীয় করে রাখতে চান, তাহলে আপনাকে একবার অন্তত যেতেই হবে কলেজ স্ট্রীট চত্বরে ‘ কল্পতরু ভান্ডারে ’। কোলকাতার প্রাচীন ও ঐতিহ্যশালী পান দোকানগুলির মধ্যে অন্যতম এই পান দোকান-এর ঠিকানা :- ৬/১, বঙ্কিম চ্যাটারজি স্ট্রীট । কলেজ স্কোয়ার-এর পেছন দিকে।


 এখানে পান পাবেন ৬ রকমের ।





 প্রতিটি পানের স্বাদ ও সুবাস আলাদা আলাদা । সব থেকে বেশি দামের পান হল ‘ বাদশাহি পান ’ । এর মুল্য মাত্র ৫০১ টাকা। একবার মুখে দিলেই বুঝবেন এর গুনাগুণ । মুখের মধ্যে এই পানের আবেশ প্রায় কয়েক ঘন্টা থেকে যাবে।

তৈরী হচ্ছে বাদসাহী পান


পান সাজতে ব্যাস্ত দত্তবাবু
 এই পান দোকান স্থাপনা করেন পান সম্রাট সনাতন দত্ত । যাঁর আদি নিবাস ছিল আধুনা বাংলাদেশের ঢাকা শহরে। 



কল্পতরু ভান্ডারের বর্তমান মালিক শ্রী দত্ত বাবু।
 দোকানে গেলে দেখতে পাবেন , ফ্রেমে বাঁধাই করা বহু বিশিষ্ট জনের স্বাক্ষরিত শংসাপত্র সহ তাদের ছবি । বিভিন্ন সময়ে বহু বিশিষ্ট জন এখানে পান খেয়ে গেছেন , বহু অনুষ্ঠানে বহু গুণী মানুষের কাছে সরবরাহ হয়েছে এই দোকানের পান।
জাদুকর পি সি সরকার-এর সাক্ষরিত শংসাপত্র 


অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় -এর স্বাক্ষরিত শংসাপত্র
'' কল্পতরুর পান ? আ হা হা , এক জোড়া দিন আর এক জোড়া বেঁধে দিন '' -
প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী মান্না দে মহাশয়।
 বাদসাহী, বেনারসি রুচী , মন মাতোয়ারা , দিল খোস -এই চার রকমের পান খাওয়ার সৌভাগ্যই আমার হয়েছে। প্রতিটা পানের স্বাদ আলাদা। এর মধ্যে অবশ্যই সেরা হল বাদসাহী পান। দোকানদার শ্রী দত্তবাবু জানালেন যে, এই সব পানের অনন্য স্বাদের রহস্য লুকিয়ে আছে এই সব পানে ব্যবহৃত মশালায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৮ রকমের মশালা ব্যবহৃত হয় এই বাদসাহী পানে। প্রায় ১৩/১৪ রকমের সুপারি ব্যাবহার করা হয়ে থাকে, যার কোনটা কোনটা আসে এমনকি সুদূর তামিলনাড়ু থেকে। কোনও প্রজাতির সুপারির নাম যে  ''দুধসুপারি'' হতে পারে, এর আগে আমার জানা ছিল না। সত্যিই পান সাজা একটা শিল্প বটে।
পানে ব্যবহৃত বিভিন্ন মশালা

পান সাজা হয়ে গেলে এতে দেওয়া হয় সুগন্ধযুক্ত মিঠা আতর। আর এই সুগন্ধ প্রায় কয়েক ঘন্টা থাকে। 
বাদসাহী পান 
দত্তবাবু জানালেন, তার এই ভুবন ভোলান অনবদ্য পান দেশে তো বটেই, দেশের বাইরেও বাঙ্গালি-র কাছে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছে। পান খেয়ে যদি মন ভোলাতে চান, তাহলে অবশ্যই যাবেন কলেজ স্ট্রীট চত্বরে '' কল্পতরু পান '' -এর দোকানে । 

Sunday, 19 April 2015

Paramount Sherbet :

বাঙ্গালীর রসনা তালিকায় শরবত একটা বিশেষ স্থান করে নিয়েছে । নানা ধরনের শরবত আছে আমাদের পানীয় তালিকায় , যা লিখে শেষ করা যাবে না। তেমনই কোলকাতার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে নানান ধরনের শরবতের দোকান । যার মধ্যে আছে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী শরবতের দোকান । এর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শরবতের দোকান হল এই Paramount .
কলেজ স্ট্রিট এলাকার বই-এর দোকানগুলি ছাড়িয়ে বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রীটের বাঁদিকের ফুটপাথ ধরে কিছুটা এগোলেই এই দোকান দেখতে পাবেন।



এই দোকান প্রায় ৯৬ বছরের পুরনো । কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসবেন মূল দোকান ঘরে। কাঠের কড়িবর্গা , কুলুঙ্গি , দেওয়ালে টাঙ্গান পুরনো ছবি, আর কয়েকটা বিশাল আকৃতি হরিণের শিং দোকানটিতে সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা আবহের সৃষ্টি করেছে। প্রতিষ্ঠাতা নিহাররঞ্জন মজুমদার ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। সে সময় এই দোকান ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আলোচনার একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা । দোকানের পেছন দিকে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মগোপনের অন্যতম একটি জায়গা ।



এই সুদীর্ঘ সময়ে এই দোকানের খুব বেশি কিছু পরিবর্তন হয়নি। তাই যখন এখানকার কোনও টেবিলে বসে শরবত খাবেন, মনে রাখবেন, এরই কোনও একটিতে বসে হয়ত সুভাষ চন্দ্র বোস তার পরবর্তী কার্যকলাপের পর্যালোচনা করছিলেন ।




এই দোকানের মূল আকর্ষণ হল ‘ ডাব শরবত ’ । ডাবের জলের সাথে বরফ আর শাঁস দিয়ে বানান হয় এই শরবত । এর স্বাদ বর্ণনাতীত , না খেলে বোঝা যাবে না এর স্বর্গীয় স্বাদ ।


ডাব শরবত
এছাড়াও আছে নানান ধরনের শরবত, যেমন – প্যাশন ফ্রুট, ম্যাঙ্গো ম্যানিয়া , কোকো মালাই , পাইন্যাপেল মালাই ইত্যাদি শরবত ।
প্যাশন ফ্রুট
বিভিন্ন সময় বহু বিখ্যাত মানুষজনের পদার্পণ ঘটেছে এই দোকানে। ডাঃ মেঘনাদ সাহা । সত্যজিত রায় থেকে শুরু করে তসলিমা নাসরিন , মৃণাল সেন, অমর্ত্য সেন প্রমুখ বহু মানুষের আগমন হয়েছে এই দোকানে।



কোলকাতার বুকে এই Paramount সত্যিই একটি অনবদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ এতিহ্যবাহী দোকান হয়ে প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাঙ্গালীর রসনার যোগান দিয়ে যাচ্ছে। যদি এখনও এই দোকানে না গিয়ে থাকেন, তাহলে এখনই যান । ডাবের শরবত খেতে কিন্তু ভুলবেন না J  



ভূমিকা : 

 কথায় বলে ভারতের একটা নয়, তিনটে রাজধানী আছে । দিল্লি হল পলিটিকাল রাজধানী, মুম্বই হল অর্থনৈতিক রাজধানী, আর কোলকাতা হল সাংস্কৃতিক রাজধানী । এছাড়াও যদি খাওয়া-দাওয়ার ওপর ভিত্তি করে ভারতের কোনও শহরকে রাজধানীর শিরোপা দিতে হয়, তাহলে সেই শিরোপা একমাত্র কোলকাতারই প্রাপ্য। অদ্ভুত নগরী এই কোলকাতা, সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে সস্তা খাবার আপনি এই কোলকাতাতেই পাবেন, একজন মানুষ সারাদিনে মাত্র ৬০ টাকা খরচ করেও ভাল ভাবে পেট ভরে খেতে পারবেন এই শহরে, প্রাতরাশ থেকে নৈশভোজ , সব কিছু মিলিয়ে । আর বৈচিত্রের দিক থেকে দেখতে গেলে, এত রকমের বিচিত্র খাবার কোলকাতায় পাওয়া যায়, যে, একজন পর্যটকের প্রায় একটা সারা বছর লেগে যাবে এই শহরের সব ধরনের খাবার কেবল মাত্র একবার করে চেখে দেখতে।
আমরা বাঙ্গালীরা বরাবরই একটু ভোজন রসিক। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার বৈচিত্রে, উপমহাদেশের অন্যান্য জাতিগুলির তুলনায় বাঙ্গালীর খাদ্য বৈচিত্র এমনিতেই একটু বেশি । তার ওপর কয়েক শতক ধরে এখানে নানা জাতি, নানা ভাষার মানুষের সমাগম ঘটেছে, আর তাদের সংস্পর্শে এসে বাঙ্গালীর খাদ্য তালিকাও যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে। কোলকাতায় যত ভাল চাইনিস খাবার পাওয়া যায়, তত ভাল চাইনিস খাবার বোধ হয় চীন দেশেও পাওয়া যায় না।
এই ব্লগের উদ্দেশ্য হল কোলকাতার সেই বিখ্যাত মুখরোচক খাবার গুলিকে তুলে ধরা। দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে, যতটুকু সামান্য সময় পাই, সেই সামান্য সময়ের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস যদি পাঠকগণের ভাল লাগে, তাহলে সেটাই আমার বড় প্রাপ্তি ।